মদিনার কোবরা রোড়ে থাকা এ ৯০ ভাগ দোকান মালিক বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা
শিশির মাহমুদ, সৌদি থেকে ফিরে
চট্টগ্রাম নগরের মাদারবাড়ির পথকলি গলির বাসিন্দা মো. শিশির মাহমুদ। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে(নয় মাস আগে) ওমরাহ হজ করতে সৌদি আরবের মক্কা-মদিনায় যান। তখন তিনি এক কেজি আজওয়া খেজুর ১০ সৌদি রিয়েলে(৩৩০ টাকায়) কিনেছিলেন। কিন্তু চলতি রমজানের প্রথম সপ্তাহে তিনি ফের ওমরাহ হজ করতে যান সৌদি আরব। কিন্ত এবার তাকে মদিনায় ওই একই খেজুর কিনতে হয়েছে ১৫ থেকে ২০ রিয়েলের মধ্যে(৪৯৫ থেকে ৬৬০ টাকায়)। রমজানে এক খেজুরের দাম বেড়েছে এক থেকে প্রায় দেড় গুণ। একইভাবে সাগর কলা, আঙ্গুর, আপেল, কমলার দামও নয় মাসের ব্যবধানে বেড়েছে তিন থেকে পাঁচ রিয়েল। সাগর কলা নয় মাস আগে প্রতি কেজি পাঁচ থেকে ছয় রিয়েলে কিনতে পারলেও রমজানে কলা, আঙ্গুর, কমলা ও আপেল বাড়তি রিয়েল খরচ করে ১০ থেকে ১২ রিয়েলে কিনতে হচ্ছে ওমরাহ প্রবাসীদের।
শুধু খাদ্যপণ্য নয়; নয় মাস আগে একটি টুপি এক রিয়েলে(৩৩ টাকা) বিক্রি হলেও রমজানে মক্কা-মদিনার দোকানে সেই টুপি বিক্রি করা হচ্ছে দুই রিয়েলে(৬৬ টাকায়)। তসবিহ, জায়নামাজ, বোরখা, জুব্বাসহ(পাঞ্জাবি) নানান ধরণের পোষাকেও লেগেছে দাম বাড়ার আগুন। এক রিয়েলের তসবিহ রমজানে দুই রিয়েল, নয় মাস আগের ১০ রিয়েলের জায়নামাজ ১৫ রিয়েল, ১৫ রিয়েলে জায়নামাজ ২০ রিয়েল, ১৫ রিয়েলের জায়নামাজ ২৫ রিয়েলে এখন বিক্রি চলচ্ছে। একইভাবে ১০ রিয়েলের জুব্বা(পাঞ্জাবি) ১৫ টাকা, ১৫ রিয়েলের জুব্বা ২০ রিয়েল, ২০ রিয়েলের জুব্বা ২৫ টাকায় বিক্রি করছেন মক্কার ব্যবসায়ীরা। মদিনার কুবা রোড ও আশপাশ ঘিরে হাজারের বেশি দোকান এভাবেই চলছে ব্যবসা-বাণিজ্য। এছাড়া বেলাল মসজিদ এলাকার আশপাশেও আরো কয়েকশ’ দোকানও চলছে একই ধরণের বাণিজ্য। এসব এলাকায় খাদ্যপণ্য, পোষাক, খেজুর, কসমেটিকস, জুয়েলারির দোকানের ৯০ ভাগ ক্রেতাই ওমরাহ হজযাত্রীরা। সাধারণত সারা বছর পৃথিবীর সব দেশ থেকেই মুসলিমরা ওমরাহ হজ পালন করতে যান মদিনা ও মক্কায়। মধ্যবিত্ত ও নিন্ম মধ্যবিত্ত হাজীদের কুবা ও বেলাল মসজিদ এলাকার হোটেলগুলোতে রাখা হয়। ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি হোটেলের আশপাশের দোকান থেকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে থাকেন হজযাত্রীরা। তার সুযোগ নিয়েই অন্য সময়ের তুলনায় রমজানে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে পোশাক-কসমেটিক্স, জুয়েলারির দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন এসব দোকানের ব্যবসায়ীরা।
মদিনার মতো মক্কার প্রিন্স ইব্রাহিম খলিল রোড ও মিসফালাহ খুপড়ির আশপাশে হাজারের বেশি দোকান রয়েছে। জুয়েলারি দোকানের মালিক সৌদি নাগরিক হলেও অন্য সব দোকানগুলোর মালিক বাংলাদেশী, সৌদিতে বসবাসরত রোহিঙ্গারা। সামান্য কিছু দোকান পরিচালনা করেন পাকিস্তানের নাগরিকরা। আর এসব দোকানেই নয় মাস আগের তুলনায় রজমানে সব ধরণের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
মদিনার কুবা রোডের কনমেটিক্স ব্যবসায়ী চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাসিন্দা মিনহাজ উদ্দিন বলেন, মদিনার কুবা রোড ও বেলাল মসজিদ এলাকায় থাকা হাজারের বেশি দোকানের অধিকাংশ মালিকই বাংলাদেশী। সৌদি নাগরিকদের মালিকানাধীন দোকান মাসিক ভাড়ায় নিয়ে ব্যবসা করছি আমরা। বাংলাদেশী ছাড়া এখানে কিছু পাকিস্তানির দোকানিও রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশী পরিচয় দিয়ে সৌদি আরবে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন।
রমজানে বাংলাদেশের মতো পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে মিনহাজ উদ্দিন বলেন, রমজানে অন্য সময়ের তুলনায় বেচাকেনা একটু বেশি হয়। তাই দোকান ও স্টাফ খরচও অন্য সময়ের তুলনায় একটু বেশি। তাই সব পণ্যে নয় কিছু পণ্যের দাম একটু বাড়িয়ে নেওয়া হয় বাড়তি খরচটা তুলে নেওয়ার জন্য।
মদিনার খেজুর বিক্রিতা পাকিস্তানি নাগরিক আবদুর রাজ্জাক বলেন, সৌদি আরবে এখন খেজুরের মৌসুম নয়। তাই আগের তুলনায় একটু দাম বেশি। যখন গাছে খেজুর পাঁকে, নতুন নতুন খেজুর বাজারে আসে তখন দাম কম থাকে। এখন কোল্ড স্টোরেজ থেকে বেশি দামে কিনে আনতে হয়। তাই আগের তুলনায় পাঁচ থেকে সাত রিয়েল দাম বেশি নিতে হচ্ছে। আমি নয়, খেজুর বিক্রির সাথে জড়িত এখানে সবাই বাড়তি দামে খেজুর বিক্রি করছে।
মক্কায় প্রিন্স ইব্রাহিম খলিল রোডে অবস্থিত ফিলিস্তিনি হোটেলের পাশে থাকা ব্যারাইটি পণ্যের দোকান মালিক মো. আলী। চট্টগ্রামে তার বাড়ি বললেও পরে জানান তাদের পূর্বপুরুষ আরাকানের বাসিন্দা। আলী বলেন, আমার জন্ম সৌদি আরবে। এখানে সাত-আট বছর ধরে ব্যবসা করছি। সারাবছর ব্যবসা করে খুব বেশি লাভ করা যায় না। রমজানে সারা পৃথিবী থেকে লাখ লাখ মানুষ মক্কায় আসায় জুব্বা, বোরখা, টুপি, তসবিহ, কসমেটিক্সসহ নানান পণ্য বিক্রি করে ভালো এমাউন্ট আয় করতে পারি। রমজানে সব খরচ বেশি হওয়ায় সামান্য একটু দাম বাড়িয়ে নিতে হচ্ছে। এটা শুধু আমার দোকানেই নয়, মক্কার প্রতিটি দোকান ও লুলু শোরুমের পণ্যের দাম সামান্য বাড়তি নেওয়া হচ্ছে।
নাজিম উদ্দিন নামে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার বাসিন্দা বলেন, সৌদি আগে সবসময় পণ্যেও দাম একই থাকতো। এখন প্রতিদিন দোকানের বাড়া আগের তুলনায় কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে সৌদি নাগরিকরা। এছাড়া সৌদি সরকার টেক্সেও পরিমাণও বাড়িয়েছে লাগাম ছাড়া। আমাদের ব্যবসা করে জীবন চালানোই দায় হয়ে গেছে। তাই একটু দাম বাড়ানো ছাড়া কোন উপায় নাই।
Leave a Reply